বিশ্বব্যাপী বেকারত্বের হার ২০২৪ সালে ৫ শতাংশে স্থিতিশীল ছিল। তবে কভিড-পূর্ব স্তরে শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন বা আইএলও। বৈষম্য বৃদ্ধি, যুব বেকারত্বের উচ্চ হার ও মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে কর্মক্ষমদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজপ্রাপ্তিতে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘের সংস্থাটি। খবর আনাদোলু।
৫ শতাংশ বেকারত্বের হার কভিড-১৯ মহামারী থেকে শ্রমবাজারে ক্রমাগত পুনরুদ্ধারের প্রতিফলন দেখায়। প্রতিবেদন অনুসারে, শ্রমবাজারে এখনো অনেক অন্তর্নিহিত সমস্যা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষত নিম্ন আয়ের দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ ও শ্রমিক দারিদ্র্যের হার মহামারী-পূর্ব স্তরে ফিরে এসেছে। মর্যাদা, নায্য মজুরি ও সুরক্ষা দেয় এসব দেশে এখনো এমন কাজ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
শ্রম চাহিদার বৃহত্তর পরিমাপক গ্লোবাল জবস গ্যাপ। এর দ্বারা কর্মক্ষম কিন্তু চাকরিতে অংশগ্রহণে বাধা সম্মুখীন ব্যক্তিদের সংখ্যাকে বোঝানো হয়। ২০২৪ সালে এমন ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৪০ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে রয়েছে ১৮ কোটি ৬০ লাখ বেকার, যারা কাজ করতে ইচ্ছুক কিন্তু সুযোগ পাচ্ছেন না। বিভিন্ন কারণে সাময়িকভাবে বেকার রয়েছেন ১৩ কোটি ৭০ লাখ। এছাড়া চাকরি খুঁজে না পেয়ে বা বিভিন্ন কারণে নিরুৎসাহিত চাকরিসন্ধানী দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৯০ লাখে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহামারী-পরবর্তী সময়ে চাকরির ব্যবধান সংকুচিত হয়েছে, এটি আগামী দুই বছরে স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পুনরুদ্ধারের একটি স্থবিরতা নির্দেশ করছে বলে জানায় আইএলও।
বিশ্বব্যাপী যুবকদের মাঝে বেকারত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণে নেই ‘এনইইটি’ হিসেবে উল্লেখিত এমন তরুণদের সংখ্যা ২০২৪ সালে বেড়েছে। প্রায় ৮ কোটি ৫৮ লাখ তরুণ (১৩ দশমিক ১ শতাংশ) ও ১৭ কোটি ৩৩ লাখ তরুণী (২৮ দশমিক ২ শতাংশ) এনইইটি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। নিম্ন আয়ের দেশে তরুণদের মধ্যে ২০ দশমিক ৪ পুরুষ ও ৩৭ শতাংশ নারী এনইইটি জনসংখ্যার অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশে এ প্রবণতা যুবসমাজকে অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখোমুখি করছে বলে জানানো হয় প্রতিবেদন।
২০২৪ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৬ ও ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। বার্ষিক হিসেবে প্রবৃদ্ধির পতনের পেছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ব্যয় ও ঋণ সমস্যা।
কিছু অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির প্রশমিত হলেও এখনো উঁচু স্তরে রয়েছে, যা মজুরি হ্রাস করছে এবং প্রকৃত আয় বৃদ্ধিকে ধীর করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অল্পকিছু উন্নত অর্থনীতিতে প্রকৃত মজুরি বেড়েছে। এর বিপরীতে বেশির ভাগ দেশ মূল্যস্ফীতির চাপের মাঝে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সংগ্রাম করছে।
এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সৌর ও হাইড্রোজেন জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চাকরির সংখ্যা বেড়েছে ১ কোটি ৬২ লাখ, এর প্রায় অর্ধেক চাকরি পূর্ব এশিয়ায় কেন্দ্রীভূত। ডিজিটাল প্রযুক্তিও চাকরির জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। তবে অনেক দেশ পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও দক্ষতার অভাবে এ অগ্রগতির সুযোগ নিতে পারছে না।
শ্রমবাজারের দুর্বলতা মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আইএলওর মহাপরিচালক গিলবার্ট হুংবো। তিনি বলেন, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য অপরিহার্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান। চাপে থাকা সামাজিক সংহতি, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু প্রভাব ও ঋণ সংকট বাড়তে দেয়া যাবে না। শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং আরো ন্যায়সংগত, টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে আমাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
শিক্ষায় বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাসে সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ ও নিম্ন আয়ের দেশে উন্নয়নের জন্য রেমিট্যান্সের মতো বেসরকারি তহবিল ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের এ প্রতিবেদনে।